পিটিয়ে হত্যার ঘটনার লাগামছাড়া বৃদ্ধি, জনমনে চরম উদ্বেগ
-67f13462a7ba1.jpg)
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। ঈদের মধ্যেই গত সোমবার নরসিংদীর পলাশ উপজলার ঘোড়াশালে রাকিব (২৫) ও সাকিব (২০) নামের দুই ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় তাদের মা-বাবাও আহত হয়েছে। পুলিশের দাবি, চোর সন্দেহে তাদের গণপিটুনি দেয়া হয়েছে। যদিও নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, চাঁদা না দেয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই দিন লক্ষèীপুর সদর উপজেলায় মোবাইল চুরির অভিযোগে শ্রমিক দলের এক নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত পরিবার দাবি করেছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। গত সেপ্টেম্বরে চোর সন্দেহে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবে দেশজুড়েই অসংখ্য পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটলেও খুব কম আসামিই গ্রেফতার হচ্ছে। ওই ধরনের ঘটনায় বেশির ভাগ সময় আসামিরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এগুলোও এক ধরনের বিচার-বহির্ভূত হত্যা। এসব ঘটনার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও আসামিরা থাকে অজ্ঞাত। যথাযথভাবে মামলা হচ্ছে না। যারা ঘটাচ্ছে, তাদের ধরা হচ্ছে না। ফলে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বারবার। যা দেশের আইন-শৃঙ্খলার জন্য অশনি সংকেত। মানবাধিকার সংস্থা ও কর্মীদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
জানা যায়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে ২৭টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। তাতে নিহত হয়েছেন ১৮ জন আর আহত হন আটজন। ওসব ঘটনায় মাত্র সাতটি মামলা হয়েছে। তবে অক্টোবরের পর কতজন হত্যার শিকার হয়েছেন বা ওসব ঘটনায় মামলার বিষয়ে সংস্থাটির কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে কমপক্ষে ১৬৯টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। তাতে ১৪৬ জন মারা গেছেন এবং মারাত্মক আহত হয়েছেন ১২৬ জন। আহত অবস্থায় ৪৭ জনকে পুলিশে দেয়া হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচজন নারী ও তিনজন কিশোর রয়েছেন। বিভিন্ন সময় চুরির সন্দেহে ৫৮ জন, ডাকাতির সন্দেহে ১৩, চুরি, ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির সন্দেহে ১৬, গণধর্ষণের সন্দেহে ৫, খুনের মামলায় ৬, সন্দেহজনক চলাচলের অজুহাতে ৪, অপরাধে জড়িত থাকার সন্দেহে ৬, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে ৫, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ৬, মাদক পাচার, চোরাচালান, অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত থাকার সন্দেহে ৬ এবং জমিসংক্রানÑ বিরোধ, মৌখিক বিরোধ, মানসিক ব্যাধি, অতীত শত্রুতা ও বিভিন্ন সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে ৩৬ জন নিহত হয়েছেন। মূলত দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বেড়েছে পর গণপিটুনির ঘটনা। গত বছরের শেষ পাঁচ মাসে দেশে গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৯৮ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ওই মাসে গণপিটুনিতে ২৪ জন মারা গেছেন। অক্টোবরে ২৩ জন, আগস্টে ২০, নভেম্বর ১৪ ও ডিসেম্বর ১৭ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গণপিটুনিতে মারা গেছেন ৪৮ জন।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন ১২৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫৭ জন মারা গেছেন। তাছাড়া ২০২৩ সালে সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৫১ জন। ২০২২ সালে সারা দেশে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। ২০২১ সালে সংখ্যাটি ছিল ২৮ জন। ২০২০ সালে নিহত হয়েছিলেন ৩৫ জন, ২০১৯ সালে ৬৫ ও ২০১৮ সালে ৩৯ জন। এদিকে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৭ জন, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগেই মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে চলতি বছরের তিন মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৩৩ জন। জানুয়ারিতে ১২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৮ জন ও মার্চে ১৩ জন গণপিটুনিতে মারা গেছে। এই সময়ে আহত হয়েছে ৯৩ জন। মার্চে ৩৯টি ঘটনায় হতাহত ৬৯ জন। যার মধ্যে নিহত ১৩ ও আহত ৫৬। আর হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ ১০ বছরে দেশে অন্তত ১ হাজার ৯টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ৭৯২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো কমপক্ষে ৭৬৫ জন। সরকার পরিবর্তনের পর গত সাত মাসে (আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি) ১১৪টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিহত হয়েছেন ১১৯ জন এবং আহত হয়েছেন আরো ৭৪ জন। আর গত বছরই গণপিটুনির ঘটনায় দেশে কমপক্ষে ১৭৯ জন মারা গেছেন।
পিটিয়ে হত্যার ঘটনা প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গণপিটুনির ঘটনায় যথাযথ আইন প্রয়োগ না হওয়ায় এ অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি ওসব ঘটনা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর চিত্রকে তুলে ধরছে। আইনে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট সাজা আছে। কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় তুলে দিতে হবে। পিটিয়ে মেরে ফেলার বিধান তো কেউ দেয়নি। কোনো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি নির্দোষ। অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি অপরাধী নন।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, অপরাধ করলেও আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আদালতও সুযোগ দেন অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার কিংবা তার অভিযোগ ডিফেন্ড করার। তাহলে অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা করা নির্দোষ প্রমাণের কোনো সুযোগ থাকে না। অনেক সময় হত্যার শিকার ব্যক্তিটি অপরাধী না হওয়ারও প্রমাণ মিলে।